মাটির মানুষ

মুহাম্মদ তফিজ উদ্দিন


কৃষক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি, শিক্ষক, চিকিৎসক, বিচারক, রাজনীতিবিদ—কত পেশা, কত পরিচয়, কত বিচিত্র নাম! মানুষকে চিনতে গিয়ে অভিধান শেষ হয়, ইতিহাসের পাতা ফুরায়, তবু মানুষের পরিচয় শেষ হয় না। একই পৃথিবীতে কেউ প্রাসাদ গড়ে, কেউ সেই প্রাসাদের ইট বহন করে; কেউ সিংহাসনে বসে, কেউ সিংহাসনের ভিত্তি গড়ে। কেউ অন্যের ভাগ্য লেখে, কেউ নিজের ভাগ্য লিখতে গিয়ে সারাজীবন কলমের বদলে কোদাল চালায়।

তবু এত পরিচয়ের ভিড়ে একটি পরিচয় শুনলে কেমন যেন গা শিউরে ওঠে—মাটির মানুষ!

মাটির মানুষ! কথাটি শুনলেই মনে হয়, এ বুঝি কোনো সাধারণ পরিচয় নয়; তার বুকের ভেতর মাটি, চোখের গভীরে পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস, আর তার নীরবতার মধ্যে লুকিয়ে আছে জন্ম ও মৃত্যুর অনন্ত রহস্য। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, যে মাটিকে আমরা পায়ের নিচে মাড়াই, সেই মাটির কাছেই একদিন আমাদের সমস্ত অহংকারের অবসান ঘটে।

মানুষের জন্ম কোথায়? মায়ের গর্ভে। কিন্তু তার বেঁচে থাকার উপকরণ ছড়িয়ে আছে প্রকৃতির সর্বত্র। সেই প্রকৃতির এক গভীর আশ্রয় মাটি—যে মাটি শস্য ধারণ করে, জীবনকে পুষ্ট করে, মানুষের আশ্রয় গড়ে তোলে, আর শেষ পর্যন্ত তাকে আপন বুকে ফিরিয়ে নেয়। মাটির বুকে জন্মানো শস্য খেয়ে মানুষ বাঁচে, মাটির ওপর ঘর তুলে আশ্রয় খোঁজে, মাটিতে পা রেখে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে। তারপর একদিন সেই আকাশজয়ী মানুষই মাটির কোলে ফিরে যায়। জন্ম থেকে মৃত্যু—মানুষের এই দীর্ঘ যাত্রায় মাটি কখনো খাদ্য, কখনো আশ্রয়, কখনো কর্মক্ষেত্র, কখনো শেষ ঠিকানার প্রতীক।

তাহলে প্রশ্ন জাগে, যে মাটির কাছে মানুষের এত ঋণ, সেই মাটির মানুষ হতে লজ্জা কোথায়?

লজ্জা তো মাটিতে নয়; লজ্জা মানুষের অহংকারে। লজ্জা সেই চোখে, যে চোখ শ্রমিকের ঘাম দেখে না; সেই বিবেকে, যে বিবেক কৃষকের অন্ন খেয়ে কৃষককেই অবহেলা করে; সেই সভ্যতায়, যে সভ্যতা মাটির বুক থেকে সম্পদ তুলে আনে, অথচ মাটির মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে না।

আমরা পরিচয়ের বড়াই করি। কেউ বলে, আমি বড় কর্মকর্তা; কেউ বলে, আমার অনেক টাকা; কেউ বলে, আমার ক্ষমতার সামনে সবাই নত হয়। অথচ কেউ একবারও ভাবে না—ক্ষমতা কি মৃত্যুকে থামাতে পারে? অর্থ কি বার্ধক্যকে কিনে নিতে পারে? পদবি কি কবরের অন্ধকারে আলো জ্বালাতে পারে? যে মানুষ আজ নিজের নামের আগে দশটি উপাধি বসিয়ে অন্যকে ছোট করে, কাল তার নামের পাশে হয়তো শুধু দুটি তারিখ লেখা থাকবে—জন্ম ও মৃত্যু।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ এই যে, মানুষ যত বড় হতে চায়, ততই অনেক সময় নিজের শিকড় ভুলে যায়। গাছ যত উঁচুই হোক, শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হলে তার পতন অনিবার্য। নদী উৎসকে ভুলে গেলে তার স্রোতও একদিন পথ হারায়। আর মানুষ যদি নিজের উৎপত্তি, অন্যের শ্রম ও মানবিকতার ঋণ ভুলে যায়, তবে তার উন্নতি যতই উঁচু হোক, অন্তরটা ক্রমশ শূন্য হয়ে ওঠে।

মাটির মানুষ মানে কি শুধু গ্রামের সরল কৃষক? শুধু ধুলোমাখা পায়ের দিনমজুর? শুধু ঘাম ঝরানো শ্রমিক? না, মাটির মানুষ কোনো নির্দিষ্ট পেশার নাম নয়। এটি একটি দর্শন, একটি চরিত্র, একটি মানবিক অবস্থান। যে মানুষ ক্ষমতা পেয়েও বিনয় হারায় না, সম্পদ পেয়েও দরিদ্রকে তুচ্ছ করে না, জ্ঞান অর্জন করেও শেখার দরজা বন্ধ করে না, ভুল করেও সত্যের কাছে ফিরে আসতে লজ্জা পায় না—সেই তো মাটির মানুষ।

মাটির বিশেষত্ব কী? তার বুকে বীজ পুঁতে দিলে সে নতুন জীবনের সম্ভাবনা ধারণ করে; ভাঙা ঘরের মাটিও আবার নতুন আশ্রয় গড়ার উপকরণ হয়। মাটি নিজের মহত্ত্ব ঘোষণা করে না, অথচ তার নীরব অবদান ছাড়া পৃথিবীর জীবন অসম্পূর্ণ। প্রকৃতি যেন আমাদের শিখিয়ে দেয়—মহত্ত্বের জন্য সব সময় উচ্চকণ্ঠ হতে হয় না; কখনো কখনো নীরবে উপকার করাই মহত্ত্বের সর্বোচ্চ ভাষা।

মানুষও যদি মাটির মতো হতে পারত! তার কাছে এলে কেউ অপমান নিয়ে ফিরত না, তার হাতে ক্ষমতা থাকলেও দুর্বল মানুষ নিরাপদ বোধ করত, তার জ্ঞান অন্যকে ছোট করার অস্ত্র হতো না। সে বুঝত, মানুষকে বড় করে তার আসন নয়, তার আচরণ; তার পোশাক নয়, তার বিবেক; তার পরিচিতি নয়, তার অনুপস্থিতিতে মানুষের মনে রেখে যাওয়া ভালোবাসা।

কিন্তু হায়! আমরা মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আকাশের মালিক হতে চাই। নিজের বাড়ির মেঝে পরিষ্কার রাখি, অথচ মনের ভেতর জমিয়ে রাখি হিংসা, লোভ, প্রতারণা ও অহংকারের আবর্জনা। শরীরের ধুলো ধুয়ে ফেলতে কত আয়োজন, অথচ আত্মার ময়লা পরিষ্কার করতে আমাদের কত অনীহা! আমরা মানুষের মুখ দেখি, পোশাক দেখি, সম্পদ দেখি; কিন্তু তার চোখের জল, ক্ষুধার্ত সন্তানের মুখ, নির্ঘুম রাতের দীর্ঘশ্বাস—এসব দেখার সময় কোথায়?

একজন কৃষক যখন ভোরের কুয়াশা ভেদ করে মাঠে যায়, তখন সে শুধু জমি চাষ করে না; সে অগণিত মানুষের জীবনের সম্ভাবনা বুনে দেয়। একজন শ্রমিক যখন রোদে পুড়ে ইট বহন করে, তখন সে শুধু মজুরির জন্য কাজ করে না; সে অচেনা মানুষের আশ্রয়ের ভিত গড়ে। একজন মা যখন নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন, তখন তিনি ত্যাগের নীরব ইতিহাস লেখেন। আর একজন সৎ মানুষ যখন শত প্রলোভনের মধ্যেও অন্যায়কে প্রত্যাখ্যান করেন, তখন তিনি প্রমাণ করেন—মানুষের প্রকৃত উচ্চতা তার দেহের গঠনে নয়, তার নৈতিক দৃঢ়তায়।

তাহলে মাটির মানুষকে আমরা চিনব কীভাবে?

তার হাতে মাটি লেগে আছে কি না, তা দিয়ে নয়; তার হৃদয়ে মানুষের জন্য জায়গা আছে কি না, তা দিয়ে। তার পায়ে জুতা আছে কি নেই, তা দিয়ে নয়; সে অন্যের পথে কাঁটা বিছায়, নাকি কাঁটা সরিয়ে দেয়, তা দিয়ে। তার ঘরে সোনা আছে কি নেই, তা দিয়ে নয়; তার বিবেক বিক্রি হয়ে গেছে কি না, তা দিয়ে।

মাটির মানুষ কখনো নিজেকে পৃথিবীর কেন্দ্র ভাবে না। সে জানে, তার আগে অসংখ্য মানুষ এসেছে, তার পরেও অসংখ্য মানুষ আসবে। তার জীবন ক্ষণিকের, কিন্তু তার কাজের প্রভাব দীর্ঘ হতে পারে। একটি ভালো কথা কারও ভেঙে পড়া মনকে বাঁচিয়ে দিতে পারে; একটি ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত বহু মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে; একটি সৎ কর্ম প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখাতে পারে। মানুষ একদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়, কিন্তু তার মানবিকতার বীজ অন্য মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকতে পারে।

এখানেই মাটির মানুষের মহত্ত্ব। সে অমরত্ব খোঁজে না নিজের মূর্তিতে; খোঁজে মানুষের উপকারে। সে চায় না সবাই তাকে ভয় করুক; চায়, কেউ যেন তার কারণে অন্যায়ের শিকার না হয়। সে পৃথিবীকে নিজের সম্পত্তি ভাবে না; ভাবে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রক্ষা করে যাওয়ার এক আমানত। সে শুধু পৃথিবী থেকে গ্রহণ করে না, নিজের শ্রম, জ্ঞান ও ভালোবাসা দিয়ে ফিরিয়েও দেয়।

একদিন আমাদের সবার পরিচয় বদলে যাবে। আজকের ক্ষমতাবান কাল অসহায় হতে পারেন, আজকের ধনী কাল নিঃস্ব হতে পারেন, আজকের সুস্থ মানুষ কাল অন্যের সাহায্যের অপেক্ষায় থাকতে পারেন। সময় কাউকে স্থায়ী সিংহাসন দেয় না। তাই মানুষের উচিত এমন কিছু অর্জন করা, যা সময় সহজে মুছে দিতে পারে না—সততা, সহমর্মিতা, প্রজ্ঞা ও মানুষের প্রতি সম্মান।

আমি তাই বলি, মাটির মানুষ হওয়া ছোট হওয়া নয়; বরং অহংকারের ভার নামিয়ে সত্যিকার মানুষ হয়ে ওঠা। মাটির মানুষ হওয়া মানে নিজের শিকড়কে জানা, অন্যের শ্রমকে সম্মান করা, সত্যের সামনে মাথা নত করা এবং মানুষের দুঃখে নিজের হৃদয়কে জাগিয়ে রাখা।

পৃথিবীতে কত ধরনের মানুষ আছে, তা গুনে শেষ করা যাবে না। কিন্তু মানুষের ভেতরে সত্যিকারের মানুষ কতজন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে।

নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হবে—আমি কি শুধু পরিচয়ে মানুষ, নাকি আচরণেও মানুষ? আমার সাফল্যে অন্যের চোখে আলো জ্বলে, নাকি আমার অহংকারে অন্যের চোখে জল আসে? আমি কি মাটির কাছ থেকে শুধু ফসল নিই, নাকি মাটির মতো অন্যের জীবনেও কল্যাণের বীজ বুনি?

মনে রেখো, মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকে বীজের ভবিষ্যৎ, আর মানুষের গভীরে লুকিয়ে থাকে তার প্রকৃত পরিচয়। বাইরের চাকচিক্য দেখে মানুষকে বিচার করা সহজ; তার অন্তরের সত্যকে চিনতে পারাই কঠিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *